দীর্ঘদিনের পাইলসের চিকিৎসা

দীর্ঘদিনের পাইলসের চিকিৎসা | ডা. ফারিদুল ইসলাম

দীর্ঘদিনের পাইলস কী?

দীর্ঘদিনের পাইলস বলতে এমন পাইলস বা অর্শ রোগকে বোঝায়, যা কয়েক মাস বা কয়েক বছর ধরে বারবার উপসর্গ সৃষ্টি করে অথবা চিকিৎসা নেওয়ার পরও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে না। অনেক রোগী দীর্ঘদিন মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া, মলদ্বারে ব্যথা, চুলকানি, মলদ্বারে মাংস বের হওয়া বা অস্বস্তি নিয়ে থাকেন। শুরুতে সমস্যাটি ছোট হলেও সময়মতো চিকিৎসা না নিলে এটি আরও জটিল হতে পারে।তবে সুসংবাদ হলো, বর্তমানে আধুনিক কোলোরেক্টাল চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের পাইলসেরও কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব। রোগের ধরন, গ্রেড এবং উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধ, নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা, লেজার প্রযুক্তি অথবা প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।

দীর্ঘদিনের পাইলস কেন হয়?

অনেক কারণেই পাইলস দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। যেমন—

  • দীর্ঘদিনের কোষ্ঠকাঠিন্য
  • অতিরিক্ত চাপ দিয়ে মলত্যাগের অভ্যাস
  • কম আঁশযুক্ত খাবার
  • পর্যাপ্ত পানি না পান করা
  • চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রাখা
  • নিজে থেকে ওষুধ ব্যবহার করা
  • দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা
  • অতিরিক্ত ওজন
  • গর্ভাবস্থার পর সমস্যা অব্যাহত থাকা
  • পারিবারিক প্রবণতা

দীর্ঘদিনের পাইলসের লক্ষণ

নিচের লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন ধরে থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—

  • বারবার মলত্যাগের সময় রক্ত পড়া
  • মলদ্বারে মাংস বের হওয়া
  • মলদ্বারে ব্যথা বা অস্বস্তি
  • চুলকানি ও জ্বালাপোড়া
  • মলদ্বারে ফোলা
  • বসতে কষ্ট হওয়া
  • মলত্যাগের পরও অস্বস্তি অনুভব করা

দীর্ঘদিনের পাইলসের ঝুঁকি

চিকিৎসা না নিলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত জটিলতা দেখা দিতে পারে—

  • বারবার রক্তক্ষরণ
  • রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)
  • তীব্র ব্যথা
  • রক্ত জমাট (Thrombosed Hemorrhoid)
  • পাইলস বাইরে বের হয়ে আটকে যাওয়া (Prolapsed Hemorrhoid)
  • দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা

কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?

দীর্ঘদিনের পাইলসের ক্ষেত্রে সঠিক রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব রক্তপাত বা মলদ্বারের সমস্যা পাইলসের কারণে হয় না।

চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী করতে পারেন—

  • রোগের বিস্তারিত ইতিহাস নেওয়া
  • শারীরিক পরীক্ষা
  • Digital Rectal Examination (DRE)
  • Anoscopy
  • Proctoscopy
  • Colonoscopy (বিশেষ ক্ষেত্রে, বিশেষ করে দীর্ঘদিন রক্তপাত থাকলে)

দীর্ঘদিনের পাইলসের আধুনিক চিকিৎসা

১. ওষুধ

প্রাথমিক বা হালকা উপসর্গে চিকিৎসক দিতে পারেন—

  • মল নরম করার ওষুধ
  • ব্যথা ও প্রদাহ কমানোর ওষুধ
  • স্থানীয় ক্রিম বা সাপোজিটরি

শুধু ওষুধে দীর্ঘদিন সমস্যা চাপা না রেখে নিয়মিত ফলো-আপ করা জরুরি।

২. খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন

দীর্ঘমেয়াদি সফল চিকিৎসার জন্য—

  • প্রতিদিন ২৫–৩০ গ্রাম আঁশযুক্ত খাবার খান।
  • ২–৩ লিটার পানি পান করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলুন।
  • টয়লেটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকবেন না।

৩. Rubber Band Ligation

গ্রেড–১ এবং অনেক গ্রেড–২ অভ্যন্তরীণ পাইলসের জন্য কার্যকর একটি নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা। এতে পাইলসের গোড়ায় রাবার ব্যান্ড লাগিয়ে আক্রান্ত টিস্যু শুকিয়ে ফেলা হয়।

৪. Sclerotherapy

বিশেষ ওষুধ ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তনালিকে সংকুচিত করা হয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে এটি ভালো ফল দিতে পারে।

৫. Infrared Coagulation (IRC)

প্রাথমিক পর্যায়ের নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে ইনফ্রারেড তাপ ব্যবহার করে চিকিৎসা করা হয়।


৬. Laser Piles Treatment

কিছু দীর্ঘদিনের পাইলস রোগীর ক্ষেত্রে Laser Piles Treatment বিবেচনা করা হতে পারে।

সম্ভাব্য সুবিধা—

  • তুলনামূলক কম ব্যথা
  • কম রক্তপাত
  • দ্রুত সুস্থ হওয়া
  • দৈনন্দিন কাজে দ্রুত ফিরে যাওয়া

তবে লেজার চিকিৎসা সব রোগীর জন্য উপযুক্ত নয়। রোগের গ্রেড ও অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

৭. অস্ত্রোপচার

যদি পাইলস বড় হয়ে যায়, বারবার বাইরে বের হয় বা অন্যান্য চিকিৎসায় উপকার না হয়, তাহলে অস্ত্রোপচার সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে।

প্রচলিত পদ্ধতি—

  • Hemorrhoidectomy
  • Stapled Hemorrhoidopexy (নির্বাচিত ক্ষেত্রে)

চিকিৎসার পর কী করবেন?

চিকিৎসার ফল দীর্ঘদিন বজায় রাখতে—

  • প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
  • আঁশযুক্ত খাবার নিয়মিত খান।
  • মলত্যাগের সময় অতিরিক্ত চাপ দেবেন না।
  • কুসুম গরম পানিতে সিটজ বাথ করুন (প্রয়োজন হলে)।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন।
  • নিয়মিত ফলো-আপ করুন।

দীর্ঘদিনের পাইলস প্রতিরোধের উপায়

  • কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করুন।
  • প্রতিদিন ফল ও শাকসবজি খান।
  • দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলে মাঝে মাঝে হাঁটুন।
  • স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
  • পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

কেন ডা. ফারিদুল ইসলাম?

ডা. ফারিদুল ইসলাম দীর্ঘদিনের পাইলস, এনাল ফিশার, এনাল ফিস্টুলা এবং অন্যান্য কোলোরেক্টাল রোগের আধুনিক চিকিৎসায় অভিজ্ঞ।

চিকিৎসার বিশেষ সুবিধা

  • সঠিক রোগ নির্ণয়
  • রোগের গ্রেড অনুযায়ী চিকিৎসা
  • আধুনিক নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা
  • প্রয়োজনে লেজার প্রযুক্তির ব্যবহার
  • জটিল পাইলসের সার্জিক্যাল চিকিৎসা
  • নিয়মিত ফলো-আপ ও জীবনযাত্রা বিষয়ক পরামর্শ

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

দীর্ঘদিনের পাইলস কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?

অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ভালো ফল পাওয়া যায়। তবে পুনরায় সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা বজায় রাখা জরুরি।

বহু বছরের পাইলসে কি অপারেশন লাগবেই?

না। সব রোগীর অপারেশন প্রয়োজন হয় না। রোগের গ্রেড ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

দীর্ঘদিন রক্ত পড়লে কী করবেন?

এটি শুধু পাইলসের কারণেই হচ্ছে ধরে নেওয়া উচিত নয়। দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে পরীক্ষা করিয়ে কারণ নিশ্চিত করতে হবে।

লেজার চিকিৎসা কি পুরোনো পাইলসের জন্য কার্যকর?

নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। তবে এটি সব ধরনের দীর্ঘদিনের পাইলসের জন্য উপযুক্ত নয়।

উপসংহার

দীর্ঘদিনের পাইলসের চিকিৎসা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত ও কার্যকর। রোগকে লুকিয়ে না রেখে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে জটিলতা এড়ানো যায় এবং রোগের পর্যায় অনুযায়ী সবচেয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা নির্বাচন করা সম্ভব।আপনি যদি দীর্ঘদিন ধরে পাইলস, মলত্যাগের সময় রক্তপাত, মলদ্বারে ব্যথা, মাংস বের হওয়া বা অন্যান্য মলদ্বারের সমস্যায় ভুগে থাকেন, তাহলে ডা. ফারিদুল ইসলাম-এর পরামর্শ নিন। আধুনিক রোগ নির্ণয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং নিয়মিত ফলো-আপের মাধ্যমে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব।